উড়োজাহাজের কন্ট্রোল সার্ফেস নিয়ে আজকের আলোচনা, উড়োজাহাজকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দুই ধরনের কন্ট্রোল সার্ফেস ব্যবহার করা হয়, যা পাইলট ককপিট থেকে নিজে বা অটোপাইলট নিয়ন্ত্রণ করে ।
উড়োজাহাজের কন্ট্রোল সার্ফেস
কন্ট্রোল সার্ফেস প্রধানত দুই ধরনের
১. প্রাইমারি/প্রধান কন্ট্রোল সার্ফেস
২. সেকেন্ডারি সহযোগী ফ্লাইট কন্ট্রোল সার্ফেস
১. প্রাইমারি/প্রধান কন্ট্রোল সার্ফেস
প্রাইমারি বা প্রধান ফ্লাইট কন্ট্রোল সার্ফেস সমূহ তিন ভাগে বিভক্ত
১. এলিরন মূল উইংসময়ের পেছনে সংযুক্ত থাকে ।
২. এলিভেটর উড়োজাহাজের পেছনের সমান্তরাল ডানার পেছনে যুক্ত থাকে।
৩. রাডার পেছনের খাড়া ডানার পেছনে যুক্ত থাকে।
এলিরন
যখন পাখি ডানে কিংবা বাঁয়ে যেতে চায় তখন তার ডানার সাহায্যের প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনিভাবে উড়োজাহাজ যখন নীল আকাশে পাড়ি দেয় তখন তার ডানার প্রয়োজন হয়, যা উড়তে সাহায্য করে এবং উড়োজাহাজ ডানে কিংবা বাঁয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় এলিরন ।
উড়োজাহাজকে ডানে নেওয়ার জন্য পাইলট কন্ট্রোল হুইল ডানে কাত করান, এতে করে ডানে এলিরন উপরে উঠে ও বাঁ এলিরন নিচে নেমে যায় এবং এর ফলে বাতাস উড়োজাহাজের ডান ডানাকে নিচের দিকে চাপ প্রয়োগ করে। ঠিক তেমনিভাবে বাঁ দিকে নেওয়ার জন্য পাইলট কন্ট্রোল হুইলকে বাঁ দিকে কাত করান আর এভাবেই পাইলট কন্ট্রোল হুইলকে ডানে বা বাঁয়ে কাত করানোর মাধ্যমে উড়োজাহাজকে ডানে বা বাঁয়ে নিয়ে যান ।
এলিভেটর
উড়োজাহাজকে উপরে কিংবা নিচে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। আগের স্থিতাবস্থায় রাখার জন্যও এলিভেটর ব্যবহার করা হয়। ককপিট থেকে কন্ট্রোল কলাম দিয়ে এলিভেটর নিয়ন্ত্রণ করা হয় ।
ব্যবহার
উড়োজাহাজকে পাইলট যখন উপরে নিয়ে যেতে চান তখন তিনি কন্ট্রোল কলামকে পেছনের দিকে টানেন। যার ফলে এলিভেটর দুইটি উপরের দিকে উঠে যায়। এমতাবস্থায় দ্রুত বাতাস প্রবাহিত হয়ে এলিভেটরের গায়ে ধাক্কা লাগে। ঠিক তখনই উড়োজাহাজের টেল নিচের দিকে যেতে থাকে এবং সম্মুখ ভাগ উপরের দিকে উড়ে যেতে থাকে।
এভাবেই কন্ট্রোল কলাম সামনের দিকে দিলে এলিভেটর নিচের দিকে যায় আর টেইল বা লেজ উপরে উঠে এবং জাহাজ নিচের দিকে যেতে থাকে। বলা বাহুল্য এলিভেটরের সংখ্যা উড়োজাহাজের উপর নির্ভর করে সংখ্যায় কম বা বেশি হয়ে থাকে।
রাড়ার
উড়োজাহাজ ডানে যাবে না বাঁয়ে যাবে তা নির্ভর করে উড়োজাহাজের রাডারের ওপর। রাডার দেখতে লম্বা যা পেছনের ডানার সাথে সংযুক্ত থাকে।
রাডার এর ব্যবহার
১. উড়োজাহাজ ডানে বা বাঁয়ে নেওয়ার জন্য রাডার ব্যবহার করা হয়।
২. নতুন অ্যাডভান্স এয়ারক্রাস্টে একটু ভিন্নতা আছে। উড়োজাহাজকে ডানে বা বাঁয়ে নেওয়ার জন্য এক সাথে এলিরন ও রাডার ব্যবহার করে থাকেন পাইলট।
৩. পাইলট ককপিট থেকে ডান প্যাডেলে চাপ দিলে ডান দিকে যায়, আবার বাঁ দিকের প্যাডেলে চাপ দিলে বাঁ দিকে যায়।
সেকেন্ডারি/সহযোগী কন্ট্রোল সার্ফেস
যা পাইলট উড্ডয়নকালে সব সময় ব্যবহার করে না কিন্তু নিরাপদ করার লক্ষ্যে উড্ডয়নকালে সেকেন্ডারি কন্ট্রোল সার্ফেসসমূহ ব্যবহার করে থাকেন। কন্ট্রোল সার্ফেসগুলো হলো:
১ ফ্ল্যাপ
২. ফ্ল্যাট
৩. স্পয়েলার
৪ ট্যাব
৫. হরাইজন্টাল স্টেবিলাইজার
ফ্ল্যাপ
উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় ফ্ল্যাপ ব্যবহার করা হয়। যা উড়োজাহাজের ডানায় থাকে। ডানার যে অংশ, পেছনের দিকের অংশ সম্প্রসারিত করে ডানার আয়তন বৃদ্ধি করে।
ব্যবহার
১. উত্তোলন বলের জন্য ফ্ল্যাপ ব্যবহার হয়।
২ উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় ফ্ল্যাপ ব্যবহার করা হয়।
৩. উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় শেষ হলে ফ্ল্যাপ ব্যবহার হয়।
৪. উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় উড়োজাহাজের গতি কম থাকায় প্রয়োজন হয় উত্তোলন বলের আর অতিরিক্ত উত্তোলন বল সৃষ্টির জন্যই ফ্ল্যাপ ব্যবহার করা হয়।
স্ল্যাট
এয়ারক্রাফ্টের ডানার সামনের দিকে সম্প্রসারিত আকারে থাকে ফ্ল্যাট ।
ব্যবহার
১. উড্ডয়ন বল তৈরি করার জন্য স্ল্যাট ব্যবহার করা হয়।
২. ফ্ল্যাট সম্প্রসারিত হলে ডানার ওপর চক্রবক্র আকারে বাতাস প্রবাহ হয় আর এই চক্রবত্র বাতাসকে সোজা করার জন্য স্ল্যাট ব্যবহার করা হয়।
৩. ফ্ল্যাট দিয়ে কৃত্রিম বায়ু প্রবাহ করা হয় ।
স্পয়েলার
উড়োজাহাজের উত্তোলন বল কমানোর জন্য স্পয়েলার ব্যবহার করা হয়।
ব্যবহার
১. স্পয়েলার উড়োজাহাজের ডানার পেছনের উপরের অংশে থাকে এবং বাতাসকে বাধাপ্রাপ্ত করে।
২. পাইলট ককপিট থেকে কন্ট্রোল করে থাকে ।
৩. উত্তোলন বল কমানোর জন্য ব্যবহার করা হয় ।
স্পয়েলার দুই ভাগে বিভক্ত
যেমন:
১. গ্রাউন্ড স্পয়েলার
২ ফ্লাইট স্পয়েলা
গ্রাউন্ড স্পয়েলার
উড়োজাহাজ যখন ল্যান্ড করে তখন উত্তোলন বল শূন্যে নামিয়ে আনার জন্যই গ্রাউন্ড স্পয়েলার ব্যবহার করা হয়। আর এ জন্যেই এর নাম দেওয়া হয়েছে গ্রাউন্ড স্পয়েলার।
ফ্লাইট স্পয়েলার
উড়োজাহাজ যখন নীল আকাশে পাড়ি দেয়, তখন এর ব্যবহার হয়। প্রয়োজনভেদে চলন্ত অবস্থায় উত্তোলন বল কমিয়ে উচ্চতা কমানো, ডানে কিংবা বাঁয়ে যাওয়ার জন্য এলিরনের কাজে সহায়তা করে আর এ জন্য ফ্লাইট স্পয়েলার ব্যবহার করা হয়।
ট্যাব
উড্ডয়নের সময় উড়োজাহাজের অবস্থান কোনো প্রকার সংশোধন করার প্রয়োজন হলে প্রধান কন্ট্রোল সার্ফেসগুলো ব্যবহার না করে ট্যাব ব্যবহার করা হয়, উড়োজাহাজের অবস্থান ঠিক করা জন্য। সাধারণত ট্যাব চার ধরনের
যেমন:
১. টিম ট্যাব
২. সার্ভো ট্যাব
৩. ব্যালান্স ট্যাব
৪. স্প্রিং ট্যাব
ট্রিম ট্যাব
উড়োজাহাজ উড্ডয়নকালে ছোটখাটো বিচ্যুতি ঘটলে তার সমাধানের জন্য ট্রিম ট্যাব ব্যবহার করা হয়।
ব্যবহার
১. ভারসাম্য রক্ষার্থে ব্যবহার হয়।
২. কোনো ধরনের বিচ্যুতি ঘটলে তার সমাধানের জন্য ব্যবহার করা হয়।
৩. অটো পাইলট বা পাইলট নিজেই সুইচের মাধ্যমে কন্ট্রোল করে থাকেন।
সার্ভো ট্যাব
সার্ভো ট্যাব খেলনা এয়ারক্রাফ্টে ব্যবহার করা হয়। সার্ভো ট্যাব মূল কন্ট্রোল সার্ফেসগুলোকে খুব সহজে কম বল প্রয়োগের মাধ্যমে উপরে কিংবা নিচে নামানোর কাজে ব্যবহার করা হয়।
ব্যবহার
১. প্রধান কন্ট্রোল সার্ফেসকে সহজে উপরে নিচে কিংবা ডানে বা বায়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় ।
২. সার্ভো ট্যাব প্রধান কন্ট্রোল সার্ফেসের বিপরীতমুখী কাজ করে।
৩. সার্ভো ট্যাব প্রবহমান বাতাসকে বাধাপ্রাপ্ত করে প্রধান সার্ফেসকে বিপরীতমুখী ধাক্কা দেয়।
ব্যালান্স ট্যাব
ব্যালান্স ট্যাব যা বাংলায় ভারসাম্য ট্যাব বলা হয়। উড়োজাহাজের প্রধান কন্ট্রোল সার্ফেসকে উপরে বা নিচে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় ।
স্প্রিং ট্যাব
স্প্রিং ট্যাব যা সার্ভো ট্যাবের মতোই কাজ করে থাকে। কন্ট্রোল সার্ফেসের সাথে সংযুক্ত। যন্ত্রাংশগুলোকে সঠিকভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে মূল কন্ট্রোল সার্ফেসকে বিপরীত দিকে যেতে সাহায্য করে এবং কম বল প্রয়োগ করে উপরে নিচে ওঠানো ও নামানোর কাজে ব্যবহার করা হয়।
স্পিড ব্রেকার
সাইকেলে যেমন ব্রেক রয়েছে, যা গতিরোধক হিসেবে কাজ করে। ঠিক তেমনিভাবে উড়োজাহাজ যখন অবতরণ করে ঠিক তখনই গতিরোধক হিসেবে স্প্রিড ব্রেক কাজ করে। স্প্রিড ব্রেকার উড়োজাহাজের দেহের পেছনের দিকে থাকে। যা উড়োজাহাজ অবতরণের পরপর ই সম্প্রসারিত হয়ে গতিরোধ করে। বর্তমান জেট ইঞ্জিনগুলোতে ফ্ল্যাস্ট রিভার্সারও একই ধরনের কাজ করে থাকে।
হরাইজন্টাল স্ট্যাবিলাইজার
এয়ারক্রাফ্টের পেছনের সমান্তরাল ছোট দুইটি ডানাকে হরাইজন্টাল স্ট্যাবিলাইজার বলে। উড়োজাহাজ উড্ডয়নের সময় পাইলট মধ্যাকর্ষণ বলকে কেন্দ্রবুত করার লক্ষ্যে সঠিক স্থানে রাখার জন্য হরাইজন্টাল স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করে থাকেন।
উইংলেট
ডানান্বয়ে রোধক বল কমানোর জন্য উড়োজাহাজের উইংসদ্বয়ের দুই প্রান্ত উপরে কিংবা নিচে বাঁকানো থাকে। যার কারণে ঘূর্ণয়মান বাতাস তৈরি হয় না এবং রোধক বল কমে উত্তোলন বল বৃদ্ধি পায়। উল্লেখ্য উইংলেট কেবল আধুনিক এয়ারক্রাফ্টে ব্যবহার করা হয় ।
আরও দেখুনঃ
2 thoughts on “উড়োজাহাজের কন্ট্রোল সার্ফেস”