বিমান চলাচলের ইতিহাস

বিমান চলাচলের ইতিহাস নিয়ে আজকের আলোচনা। আজ আমরা কথা বলবো বিমান চলাচলের ইতিহাস নিয়ে। নভেম্বর মাস চলছে। এই নভেম্বর মাসে বিমান চলাচলের ইতিহাসে উদযাপন করার মতো প্রচুর কৃতিত্ব এবং মাইলফলক রয়েছে। প্রথম হট এয়ার বেলুন ফ্লাইট থেকে প্রথম বাণিজ্যিক এয়ারলাইন পর্যন্ত,  এভিয়েশন ইতিহাসে এই মাসটি সবচেয়ে ঘটনাবহুল।

বিমান চলাচলের ইতিহাস

বিমান চলাচলের ইতিহাস

কিভাবে শুরু হয়েছে?

বলা হয় ৫ম শতাব্দীতে চীনে ঘুড়ি আবিষ্কারের সাথে শুরু হয়েছে মানুষের বিমান চলাচলের ইতিহাস । বিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি তার চিত্রকর্মে যুক্তিবাদী বিমানের জন্য প্রথম খসড়া তৈরি করেছিলেন ১৫ শতকে। ১৬৪৭ সালে, টিটো লিভিও বুরাত্তিনি চার জোড়া গ্লাইডার উইংস সমন্বিত একটি বিমানের মডেল তৈরি করেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছিল সেটা সহ ওই পর্যন্ত কোন আবিষ্কারই একজন লোকের ওজন বহন করতে সক্ষম হচ্ছিল না।

 

বিমান চলাচলের ইতিহাস

গরম বেলুন যুগ:

পরবর্তীতে, ১৯৭০ সালে, অ্যারোনটিক্সের জনক ফ্রান্সেস্কো টেরজি একটি তত্ত্ব প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, তামার ফয়েল সিলিন্ডার দিয়ে তৈরির মাধ্যমে বাতাসের চেয়ে হালকা বিমান তৈরি সম্ভব।

১৭ শতকে হাইড্রোজেন আবিষ্কার হয়। তারপর প্রথম হাইড্রোজেন বেলুনের আবিষ্কার হয়। ১৭৮৩ সালে জ্যাক-এটিন এবং জোসেফ-মিশেল সহ মন্টগোলফিয়ার ভাইরা ফ্রান্সের অ্যানোনায়ের উপর প্রথম মানব-বিহীন গরম বায়ু বেলুন উড়িয়েছিলেন। একই বছর, তারা গিরোড ডি ভিলেট, জিন-ফ্রাঁসোয়া পিলাত্রে দে রোজিয়ের এবং জাঁ-ব্যাপটিস্ট রেভিলনের সাথে একটি পাইলটেড, টিথারযুক্ত হট এয়ার বেলুন উড়ান। এরপর তারা তাদের প্রথম অবিচ্ছিন্ন হট এয়ার বেলুন ফ্লাইট চালু করেছিল। সেই ফ্লাইট প্রায় ২৫ মিনিটে ৯ কিলোমিটার উড়েতে সক্ষম হয়েছিল।

১৮ শতকের শেষের দিকে গরম বায়ু বেলুন খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এসময় মানুষ উচ্চতা এবং বায়ুমণ্ডলের মধ্যে সম্পর্ক আবিষ্কার করে যা মানুষের ওড়ার পথকে আরও সুগম করে। তবে গরম বায়ু বেলুনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল চালচলনের অভাব বা Lack of Maneuverability।

 

বিমান চলাচলের ইতিহাস

 

এয়ারশিপের যুগ:

এরপর আসে এয়ারশিপের যুগ। চালচলনের সীমাবদ্ধতার অনেকটা কাটিয়ে ওঠা হয়। গরম বাতাসের বেলুনের বদলে, এয়ারশিপগুলি হাইড্রোজেন বা হিলিয়াম গ্যাসকে উত্তোলনের জন্য ব্যবহার করত। এয়ারশিপ প্রথম যাত্রী বহন করে উল্লেখযোগ্য দূরত্বে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

আলবার্তো সান্তোস-ডুমন্ট ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি এমন একটি এয়ারশিপ ডিজাইন করেন যার দহন ইঞ্জিন ভিতরেই ছিল, অর্থাৎ এয়ারশিপটি ছিল অবিচ্ছিন্ন। তিনি সেটা তৈরি করে সফল ভাবে ওড়াতে সামর্থ্য হন। এবার ওড়ার স্বপ্নের একটি চূড়ান্ত বাস্তবতা দেখা যায়।

১৯০১ সালে সান্তোস-ডুমন্ট প্যারিসের উপর দিয়ে “নম্বর ৬” নামে এয়ারশিপ চালু করেন। সেই এয়ারশিপ ত্রিশ মিনিটেরও কম সময়ে প্যারিস পেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। এদিকে ১৮৯৯ সালে, ফার্দিনান্দ ভন জেপেলিন দুটি ডেমলার ইঞ্জিন সহ প্রথম জেপেলিন এয়ারশিপ নির্মাণের কাজ শুরু করেন।

১৯০২ সালে, লিওনার্দো টোরেস কুইভেডো তার “দ্য জেপেলিন” নামে একটি নতুন এয়ারশিপ সংস্করণ চালু করেন। এই ডিজাইনটি প্রথম জেপেলিনের ভারসাম্য সমস্যার সমাধান করেছিলো। ১৯৩৭ সালে নিউ জার্সির লেকহার্স্টে একটি মারাত্মক দুর্ঘটনাটি ঘটে। এয়ারশিপ যুগের সমাপ্তি চিহ্নিত করে।

 

বিমান চলাচলের ইতিহাস

 

বাতাসের চেয়ে ভারী বিমান:

বাতাসের চেয়ে হালকা বিমানের অসংখ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও, তাদের অস্তিত্ব স্বল্পস্থায়ী ছিল। আকার, প্রকার, ভারবহনের ক্ষমতা বিবেচনায় এই দর্শন মানুষের প্রত্যাশার কাছাকাছি যেতে পারছিলো না। তবে এই যুগটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যুগ। এই যুগের মাধ্যমেই মানুষ বুঝতে পারে – প্রয়োজন মেটাতে হলে, বাতাসের চেয়ে ভারি বিমান বানাতে হবে এবং তা ওড়াতে হবে।

১৮৬৯ সালে, স্যামুয়েল পিয়ারপন্ট ল্যাংলিই প্রথম একটি “বাতাসের চেয়ে ভারী” কিন্তু মানুষ বিহীন টেকসই বিমান তৈরি করেছিলেন। শত্রুর উপর গুপ্তচরবৃত্তির উদ্দেশ্যে ল্যাংলিকে পরবর্তীতে মার্কিন সরকার অর্থায়ন করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নকশা সফল হয়নি।

 

ইতিহাসে রাইট ব্রাদার্স:

১৯০০ এবং ১৯০২ এর মধ্যে আমেরিকার ডেটন-ওহিও থেকে, রাইট ব্রাদার্স (উইলবার এবং অরভিল রাইট) অসংখ্য গ্লাইডার এবং ঘুড়ির মডেল ডিজাইন তৈরি ও নির্মাণ  করে পরীক্ষা করেছিলেন। তারা একটি বায়ু সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিলেন।  এছাড়া দুই শতাধিক উইং ডিজাইনে ড্র্যাগ এবং লিফট পরিমাপ করার জন্য বিভিন্ন ডিভাইস তৈরি করেছিল। অবশেষে, তাদের তৃতীয় গ্লাইডারটি সফল হয়। এই আবিস্কারের কারণে তার পূর্বসূরীদের ছাড়িয়ে গিয়ে ইতিহাসে জায়গা নিয়ে নেন। তাদের এই আবিস্কার অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে অবদান রেখেছিল।

রাইট ভাইয়েরা কাজ করছিলেন চালিত ফ্লাইটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। তারা ইয়াও কন্ট্রোল, রোল কন্ট্রোল এবং একটি স্টিয়ারেবল রাডারের জন্য উইং ওয়ার্পিং তৈরির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সমস্যার অনেকখানি সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৭ ই ডিসেম্বর, ১৯০৩ দুই ভাই সফলভাবে প্রথম ক্র-সহ ফ্লাইট চালু করেন। আধুনিক বিমান চলাচল শুরু কারা ইতিহাসে, এটিই সর্বজনীনভাবে ১ম দিন হিসেবে স্বীকৃত তারিখ। সেদিন তারা তাদের সাধারণ বিমানে মোট চারটি ফ্লাইট করেছিল। উইলবার দ্বারা চালিত দীর্ঘতম বিমানটি ৪৯ সেকেন্ডে ৮৫২ ফুট উড়েছিল।

বিমান চলাচলের ইতিহাস

 

সামরিক ব্যবহার:

বিমান উদ্ভাবিত হওয়ার সাথে সাথে সামরিক কাজে ব্যবহার শুরু হয়ে যায়। ইতালি প্রথম সামরিক অভিযানের জন্য বিমান ব্যবহার শুরু করে। তারা লিবিয়ায় তুর্কি-ইতালীয় যুদ্ধের সময় বোমা, শেল এবং পরিবহনের জন্য এয়ারশিপ এবং মনোপ্লেন ব্যবহার করেছিল।

১৯১৪ সালে, রোল্যান্ড গ্যারোস তার বিমানের সাথে একটি মেশিনগান সংযুক্ত করেন। পরের বছর, কার্ট উইন্টজেনস একটি মেশিনগান সহ ডিজাইন করা একটি ফাইটার প্লেন ব্যবহার করে, প্রথম বিমান যুদ্ধে বিজয় অর্জন করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রথম এয়ারক্রাফ্ট এর বড় আকারে সক্রিয় যুদ্ধে ব্যবহার শুরু হয়। বলা যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিমান শক্তি হারজিত নির্ধারকের ভূমিকা পালন করেছিল। যুদ্ধের সময় ফ্রান্স নেতৃস্থানীয় বিমান প্রস্তুতকারক হয়ে ওঠে। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে তারা ৬৮,০০০ এরও বেশি বিমান তৈরি করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, বিশ্বের প্রায় সব শক্তিশালী দেশ তাদের বিমান শক্তি বাড়িয়েছে। বেড়েছে ফ্লাইট-ভিত্তিক সিস্টেমের উত্পাদন এবং বিকাশ। সামরিক বাহিনী যেসব বিমান ব্যবহার করে, তা হল – ফাইটার বোমারু বিমান, কৌশলগত বোমারু বিমান, ডুব বোমারু বিমান এবং স্থল-আক্রমণ বিমান।

রাডার প্রযুক্তির উদ্ভাবন বিমানের সামরিক ব্যবহার আর – সুনির্দিষ্ট, সমন্বিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়। ১৯৪২ সালে Arado Ar 234 প্রথম জেট-চালিত বোমারু বিমান চালু হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হেলিকপ্টারেরও ব্যবহারও দ্রুত বিকাশিত হয়েছিল।

এরপর বিপ্লব বিমানের নকশা ও বানাবার উপকরণে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ডগলাস DC-3 এর কম্পন এবং শব্দ-নিয়ন্ত্রণকারী প্লাস্টিক নিরোধক, রাবারযুক্ত আসন, নির্ভরযোগ্য অল-মেটাল। এর ফলে যাত্রীবাহী বিমান ভ্রমণকারীদের জন্য আরও আরামদায়ক ও নির্ভরযোগ্য হয়েছে। ১৯৪৪ সালে বেসামরিক ফ্লাইটের নিরাপত্তা, সামঞ্জস্য এবং দক্ষতার মানসম্মত করার জন্য আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের কনভেনশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে বেসামরিক ফ্লাইট অনেক বেশি নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পরিচালনা সম্ভব হয়।

বিমান চলাচলের ইতিহাস

আধুনিক বিমানের যুগ:

আধুনিক যুগে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বিমান শিল্পে বিপ্লব আনে। ১৯৭০ এর দশকে কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন এবং কম্পিউটারাইজড উৎপাদন ব্যবস্থার কল্যাণে দ্রুত আধুনিকীকরণ সম্ভব হয়। কম্পিউটার সিমুলেশনের ব্যবহারের মাধ্যমে বিমান তৈরির জন্য আরও হালকা এবং শক্তিশালী উপকরণ তৈরি সম্ভব হয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রশিক্ষণও সহজতর হয়েছে।

আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ক্রমশ অ্যানালগ এবং মেকানিকাল যন্ত্রগুলিকে রিপ্লেস করতে থাকে। ১৯৮০ এর দশকে, ককপিটে ক্যাথোড-রে ডিসপ্লেগুলির বদলে আরও উন্নত কম্পিউটার-ভিত্তিক ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে দিয়ে প্রতিষ্ঠাপিত করা হয়। আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ছিল – ১৯৮১ সালে বোয়িং 767-এর কাঁচের ককপিট। আধুনিক ডিসপ্লে, স্বয়ংক্রিয় পাইলট ককপিটের রিসোর্স ব্যবস্থাপনা সহজ করে। ফ্লাইট নিরাপত্তার বিষয়টিও অনেক বেশি গুরুত্ব পেতে থাকে।

এর পরে আরও উন্নতি দেখেছি আমরা। যেমন বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার তৈরিতে নতুন যে যৌগিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে বিমানের ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যার ফলে জ্বালানি দক্ষতা বেড়েছে অনেক। অ্যাডভান্সড কম্পোজিট প্রেরণা দিয়েছে সুইপিং উইং টিপস তৈরির,  যার মাধ্যমে ওজন কমেছে এবং বিমানের অ্যারোডাইনামিকস উন্নত করেছে।

চলছে, চলবে:

বিমান চালনার ইতিহাস অনেক মানুষের সাফল্য, ব্যর্থতা এবং অধ্যবসায় দিয়ে ভরা দীর্ঘ ইতিহাস। প্রতিনিয়ত আও উন্নত, আরও নিরাপদ, আরও সাশ্রয়ী করার অদম্য স্বপ্ন নতুন পেশাজীবীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়ে চলেছে। আমরা আজ ড্রোন পেয়েছি। পাইলট ছাড়া এয়ারক্রাফট ওড়াবার প্রস্তুতি চলছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এই মহান আবিষ্কারের আরও উন্নয়ন চলছে, চলবে।

 

আরও দেখুন:

1 thought on “বিমান চলাচলের ইতিহাস”

Leave a Comment