বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর (BAF) বহরে অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ ও লড়াকু বিমান হিসেবে FT-7BGI একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এটি মূলত চিনের তৈরি একটি জেট প্রশিক্ষণ বিমান, যা তরুণ পাইলটদের যুদ্ধে এবং উচ্চ গতি চালনায় দক্ষ করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
FT-7BGI কী?
FT-7BGI হল Chengdu J-7 এর একটি আধুনিক সংস্করণ, যা চীনা Chengdu Aircraft Industry Group তৈরি করেছে। এটি মূলত FT-7 এর উন্নত সংস্করণ এবং F-7 ফাইটারের উপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি উন্নত প্রশিক্ষণ বিমান। FT-7BGI বিমানটি উচ্চ গতিসম্পন্ন, অত্যাধুনিক অ্যাভিয়নিক্স ও অস্ত্র ব্যবস্থা দ্বারা সজ্জিত, যা এটিকে শিক্ষানবিস পাইলটদের জন্য আদর্শ প্রশিক্ষণ বিমান হিসেবে তৈরি করেছে।
- FT-7BGI হলো চিনের Chengdu Aircraft Industry Group দ্বারা নির্মিত Chengdu J-7 সিরিজের একটি উন্নত প্রশিক্ষণ ও হালকা যুদ্ধ বিমান।
- এটি মূলত FT-7 সিরিজের আধুনিক সংস্করণ, যেখানে উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক অ্যাভিয়নিক্স সংযোজন করা হয়েছে।
- দ্বি-সীটেড (দুইজন পাইলটের জন্য) বিমান, যা পাইলট প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- দ্বি-সীটেড ককপিট: প্রশিক্ষক ও শিক্ষানবিস উভয়ের জন্য সুবিধাজনক।
- সুপারসনিক ক্ষমতা: এটি সুপারসনিক গতি অর্জন করতে পারে, যা পাইলটদের যুদ্ধকৌশল ও আক্রমণাত্মক মনোভাব গড়ে তোলায় সহায়তা করে।
- অ্যাভিয়নিক্স ও অস্ত্র ব্যবস্থা: আধুনিক রাডার, ইলেকট্রনিক সিস্টেম এবং বিমান থেকে বিমান ও বিমান থেকে ভূমি ক্ষেপণাস্ত্র বহন করার সক্ষমতা।
- অভিযান ও প্রশিক্ষণ উভয়ের জন্য উপযোগী: শিক্ষানবিস পাইলটদের জন্য কৌশলগত ও লড়াই প্রশিক্ষণের আদর্শ প্ল্যাটফর্ম।
FT-7BGI এর প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য:
- গতি ও পারফরম্যান্স:
- সুপারসনিক যাত্রা করার ক্ষমতা আছে, অর্থাৎ এটি ঘণ্টায় প্রায় ১,৪০০ কিমি গতি অর্জন করতে পারে।
- আয়তন ও ওজন:
- দৈর্ঘ্য: প্রায় ১৪.৯ মিটার
- পাখার বিস্তার: প্রায় ৯.৪ মিটার
- সর্বোচ্চ ওজন: ৯,২০০ কেজি পর্যন্ত
- ইঞ্জিন:
- একক টার্বোজেট ইঞ্জিন, সাধারণত ওয়াল্টুজ-৫ বা সিমিলার টাইপের।
- অস্ত্র সজ্জা:
- বিমান থেকে বিমান ও বিমান থেকে ভূমি হামলার জন্য বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে সক্ষম।
- ২৩ মিমি কামান সংযোজিত।
- অ্যাভিয়নিক্স:
-
- আধুনিক রাডার ও ইলেকট্রনিক সিস্টেম।
- ইঞ্জিন মনিটরিং, ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডারসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
FT-7BGI এর ব্যবহার ও ভূমিকা:
- প্রশিক্ষণ:
-
- নবীন পাইলটদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম।
- উচ্চ গতির বিমানে ফ্লাইট কন্ট্রোল ও যুদ্ধকৌশল শেখানো হয়।
- যুদ্ধ বিমান হিসেবে:
- হালকা আক্রমণ ও বায়ু প্রতিরক্ষা মিশনে ব্যবহার হয়।
- বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আকাশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
FT-7BGI এর সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
- সুবিধা:
- সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান।
- সুপারসনিক যাত্রার মাধ্যমে উচ্চমানের ফ্লাইট অভিজ্ঞতা।
- অস্ত্র বহনের ক্ষমতা থাকায় মাল্টি-রোল বিমান হিসেবে কার্যকর।
- সীমাবদ্ধতা:
-
- পুরনো প্রযুক্তির কিছু অংশ এখনও ব্যবহৃত।
- কিছু দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি চিহ্নিত।
- আধুনিক প্রতিপক্ষের তুলনায় সীমিত যুদ্ধ ক্ষমতা।
বাংলাদেশে FT-7BGI বিমান
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ২০০০-এর দশকে FT-7BGI বিমান সংগ্রহ শুরু করে, যা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পাইলটদের মধ্যে। এই বিমানটি মূলত তরুণদের উচ্চমানের লড়াই ও প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। দেশের আকাশসীমা সুরক্ষায় FT-7BGI এর অবদান অপরিসীম।
- বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ২০০০ এর দশকের গোড়ার দিকে FT-7BGI বিমান সংগ্রহ শুরু করে।
- দেশীয় আকাশসীমা রক্ষা এবং পাইলট প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নে এই বিমান ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে।
- এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পাইলটরা আধুনিক প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ বিমান চালনায় দক্ষতা অর্জন করেছে।
সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা
দু:খজনক হলেও, FT-7BGI বিমানটির সঙ্গে বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে উত্তরা এলাকায় একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পতিতস হয়েছে। যদিও দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান চলছে, তবে এটি বাংলাদেশের সামরিক ও বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর পাইলট প্রশিক্ষণ ও বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ আরও উন্নত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
FT-7BGI বিমান বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় অংশ, যা তরুণ পাইলটদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ বিমানের অভিজ্ঞতা দেয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে আসছে। দুর্ঘটনার মতো দুঃখজনক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে বলে আশা করা যায়।